গোবিন্দঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়
ছাতক, সুনামগঞ্জ।
পারিপার্শ্বিকতা, সাফল্য ব্যর্থতা, অগ্রগতি, উত্থান-পতনের সাথে সম্পৃক্ত কাল ও স্থানের নিরিখে যে কোন বিষয়ের ইতিহাস লেখা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কাজ। একটি সমাজ ব্যবস্থার অতীত জীবনাচরণ, সংগঠিত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার তথ্য নির্ভর বর্ণনা করাই হল ইতিহাস।
আঞ্চলিক ইতিহাসের উপাদান প্রকৃত ইতিহাস রচনায় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করে থাকে। পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায় ব্রিটিশ ভারতে ঐতিহাসিক বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলনের সময় এ অঞ্চলে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। ছিল একমাত্র গোবিন্দনগর এম.ই. মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠাকাল ১৯০৫। প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মৌলভী ফজলুল করিম। বিটিশ ভারতে পিছিয়ে পড়া মুসলমান তথা এলাকাবাসীর কল্যাণে এ মহতী উদ্যোগ পরবর্তীতে কেবল প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই নয় এলাকার সার্বিক উন্নয়নে আলোকবর্তিকার ন্যায় কাজ করে যাচ্ছে। ব্রিটিশ শাসনামলের শেষ দিকে আসামের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ছাতকের কৃতি পুরুষ মাওলানা আবু নছর মোহাম্মদ ওয়াহিদ। এ সময় ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি সিলেট অঞ্চলে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রভূত উন্নতি হয়। ১৯১২ সালের এক তথ্যে পাওয়া যায় বৃহত্তর ছাতকে ৫টি (পাঁচ) স্বীকৃত মিডল ইংলিশ স্কুল ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল গোবিন্দনগর এম.ই. মাদ্রাসা। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত এই মাদ্রাসার পরিচালক ও হেড মৌলভী ছিলেন মরহুম মফিজ উদ্দিন। তার মৃত্যুর পর মাদ্রাসাটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মাদ্রাসা ভবনটি প্রায় এক বৎসর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। এমনি এক প্রেক্ষাপটে এলাকার কিছু সংখ্যক মানুষ চিন্তা ভাবনা করছিলেন কি করে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু করা যায়।
সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশে কিছু মহান ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে যাদের ত্যাগ ও কর্ম প্রচেষ্টায় সমাজ উপকৃত ও আলোকিত হয়। তেমনি এক মহান ব্যক্তি এ.কে.এম. শামছুল হক ছমরু মিয়া এগিয়ে এসে গোবিন্দগঞ্জে শিক্ষার মশাল পুণ: প্রজ্জ্বলিত করেন। এ সময় অপর একজন মহান ব্যক্তি আব্দুস ছোবহান যিনি মদরিছ মাস্টার নামে সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন তিনি সহযোগিতার হাত বাড়ালেন।
১৯৫৬ সালের প্রথম দিকে শামছুল হক ছমরু মিয়া সাহেব ও মদরিছ মাস্টার সাহেব মিলে গোবিন্দনগরের মুরব্বীগণের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন মাদ্রাসার পরিত্যক্ত ঘরটিতে একটি নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে। তখন অনেকেই পরিহাস করেছিলেন। সাহায্য ও সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিলেন মৌলভী গোলাম মোস্তফা, ওয়াহাব আলী মেম্বার, মোবারক আলী, এফাজ উদ্দিন, আতাবুর রহমান, মুন্সী ওয়াহাব আলী, সফিকুল হক, মাস্টার মখছুদুল করিম, মাস্টার রইছ আলী, আবুল হোসেন, হেমেন্দ্র কুমার পুরকায়স্থ (হেম বাবু), মখলিছুর রহমান সহ অনেকেই।
১৯৫৭ সালের ১লা জানুয়ারি হতে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ৪০ জন, ৭ম শ্রেণিতে ১৪ জন এবং ৮ম শ্রেণিতে ৪ জন ছাত্র ভর্তি করে আনুষ্ঠানিকভাবে গোবিন্দগঞ্জ হাই স্কুলের যাত্রা শুরু হয়। এ সময় সরকারি স্বীকৃতি প্রাপ্তির জন্য প্রধান শিক্ষক হিসেবে বাবু মনি ব্যানার্জি (বি.এ) ছাতক, এ.কে.এম শামছুল হক ছমরু মিয়া, আব্দুস ছোবহান (মদরিছ মাস্টার) ও বাবু সমরেশ গুপ্তকে সহকারী শিক্ষক দেখিয়ে আবেদন করা হয়। সরকারী স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য সক্রিয় সহযোগিতা করেছিলেন জাতীয় পরিষদ সদস্য মৌলভী ফজলুল করিম (মুক্তির গাঁও) এবং জাতীয় পরিষদ সদস্য সিরাজুন নেছা চৌধুরী (বেগম রশিদ- দুর্গা পাশা)।
জুনিয়র হাই স্কুল হিসাবে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া যায় ০১/০১/১৯৫৮ ইং তারিখে। প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক এ.কে.এম. শামছুল হক ছমরু মিয়া ইতোমধ্যে অনিয়মিতভাবে বি.এ. পাশ করে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে অবসর গ্রহণ করেন। এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখনকার সময় গ্রামীন এলাকায় বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাসহ ছাত্রদের জায়গীরের সব বন্দোবস্ত থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্ররা ভর্তি হতে থাকে। ছাত্র জায়গীর দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুস ছোবহান (মদরিছ মাস্টার)। তিনি এলাকায় সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ছিলেন। বাল্যকাল থেকে সুহিতপুর মামার বাড়ি থেকে লেখাপড়া করে যৌবন কালে গোবিন্দনগর ওয়াহাব আলী মেম্বার সাহেব-এর বাড়িতে থাকতেন। জনশ্রুতি আছে তখনকার সময় প্রচলিত বাউলা গানে ছমরু মিয়া ও মদরিছ মাস্টার পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন।
দিন দিন ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরাতন ঘরটি সম্প্রসারণ করেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় স্কুলটি স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ১৯৬১ সালের আগস্ট মাসে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সেক্রেটারী এ.কে.এম. শামছুল হক ছমরু মিয়ার নামে প্রায় পৌনে তিন কেদার জমি এবং ওয়াহাব আলী মেম্বার ও এফাজ উদ্দিনের নামে এক কেদার জমি রেজিষ্টারী দলিল মূলে খরিদ করা হয়। এ জমির বিক্রেতা ছিলেন লক্ষীপুর নিবাসী সুরেন্দ্র কুমার দে ও হিরণ্য বালা দে। ১৯৬১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ওয়াহাব আলী মেম্বার তাঁর অংশের জমি সৈদেরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের স্থায়ী অফিস নির্মাণের জন্য দান করেন এই মর্মে- যদি উহাতে ইউনিয়নের স্থায়ী অফিস নির্মাণ না হয় তবে উক্ত জমি তার নিজ স্বত্ব বলিয়া গণ্য হবে। ১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে জনৈক হাজী আঞ্জব আলী সুনামগঞ্জ ফৌজদারী আদালতে একটি স্বত্ব মামলা দায়ের করেন। এতে উক্ত ভূমি ফৌজদারী কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় ক্রোক হইয়া মামলা চলিতে থাকে। অগ্রহায়ণ মাসে স্কুলের খরিদা জমির ধান কাটাকে কেন্দ্র করে এক মর্মান্তিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষে দুইটি মামলা দায়ের হয়। কয়েক মাস তাৎপর্যপূর্ণ মামলাগুলি চলার পর ১৯৬২ সালের জুন মাসে উভয় পক্ষের সম্মতিতে আদালতে মামলাগুলি আপোষ নিষ্পত্তি হয়। এই আদালতের আপোষ প্রসিডিং অনুসারে বিরোধীয় ভূমির উত্তরাংশে ১.৫ (দেড়) কেদার ভূমি গোবিন্দগঞ্জ জুনিয়র হাই স্কুল এবং পায়ে (আধা) কেদার ভূমি ওয়াহাব আলী প্রাপ্ত হন। বিগত ১৫/০৯/১৯৬২ তারিখে সৈদেরগাঁও ইউনিয়ন কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ফেরৎ পেয়ে ওয়াহাব আলী মেম্বার ০৪/১০/১৯৬২ তারিখে গোবিন্দগঞ্জ স্কুলের হিতার্থে এই ভূমি দান করেন।
ওয়াহাব আলী মেম্বার শিক্ষা হিতৈষী হিসাবে যে অবদান রেখেছেন তা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। প্রায় পৌনে তিন কেদার জমি দান করেন। জমি দান করে স্মরণীয় হয়ে আছেন তাহারা হলেন, মেহের উল্লাহ- তকিপুর, এ বৎসরই ডিসেম্বর মাসে স্কুল স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয় এবং বর্তমান স্থানে ২ কেদার জমি ক্রয় ও এলাকার শিক্ষা হিতৈষী ব্যক্তিবর্গ এ.কে.এম. শামছুল হক ছমরু মিয়া- জামুরাইল, ইদ্রিছ আলী- ব্রাহ্মণগাঁও, আয়বর আলী- চাঁনপুর, আব্দুর রাজ্জাক- চাঁনপুর, আব্দুল লতিফ তকিপুর, আব্দুল আজিজ-রামপুর, আব্দুল মান্নান- রামপুর। পূর্বতন স্থানের ২ কেদার জমি বিক্রি করে বর্তমান স্থানে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ইট-ভাটা পুড়িয়ে স্কুল গৃহ নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এ সময় বয়োজ্যেষ্ঠ ছাত্ররা স্কুলগৃহ নির্মাণের লক্ষ্যে এলাকার বিভিন্ন গ্রাম থেকে বাঁশ-গাছ কেটে কাঁধে বহন করে নিয়ে এসেছেন। প্রধান শিক্ষক এ.কে.এম. শামছুল হক ছমরু মিয়া দিন-রাত ছাত্রদের সাথে নিয়ে কাজ করেছেন।
১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে নতুন ভবনের কাজ আরম্ভ করে অতি দ্রুততার সাথে একটি এল সাইজ সেমি-পাকা ঘর নির্মাণ করে স্কুলটি বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত করা হয়। এ ঘরটি কালের সাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে।
আব্দুস ছোবহান (মদরিছ মাস্টার) ১৯৫৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লন্ডন পাড়ি দেন। কিন্তু ছমরু মিয়া সাহেবের ভিসা হওয়া সত্ত্বেও তিনি স্কুল ফেলে যাননি। লন্ডন গিয়েও মদরিছ মাস্টার স্কুলের জন্য চাঁদা তুলে সাহায্য করে স্মরণীয় অবদান রেখেছেন। ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দেশে এসেই আবার অবৈতনিক শিক্ষকতা শুরু করেন। এ সময় ১৯৬৫ ইংরেজির জানুয়ারি মাসে স্কুলের সম্মুখে একটি রাইছ মিল স্থাপনে বাধা দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ এসে এলাকার প্রিয়ভাজন ব্যক্তিত্ব মদরিছ মাস্টারকে গ্রেফতার করে। ছাত্রদের বাধার মুখে পুলিশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
জনশ্রুতি আছে, স্কুল প্রতিষ্ঠালগ্নে মদরিছ মাস্টার অগ্রহায়ণ মাসে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান সংগ্রহ করে স্কুলের প্রাথমিক ব্যয়ভার সংকুলান করেছেন। এছাড়াও স্কুলের সাহয্যার্থে লটারি খেলা ও নাটক মঞ্চস্থ করে স্কুলের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী, দেওয়ান ফরিদ গাজী, কলিম উদ্দিন মিলন, মুহিবুর রহমান মানিক-এর অবদানও এ মুহূর্তে উল্লেখ করা আবশ্যক।
এভাবেই ঘটনা পরম্পরায় নানা প্রতিকূক্লতা ডিঙ্গিয়ে এলাকার একটি প্রভাবশালী মহলের বিরোধীতা সত্ত্বেও গোবিন্দগঞ্জ হাই স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসাবে সুখ্যাতি অর্জন করে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে শিক্ষার আলোক বার্তা পৌঁছে দিয়ে চলছে। বর্তমানে এই স্কুলটি একটি পূর্ণাঙ্গ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়ে একটি আদর্শ মানুষ গড়ার কারখানা হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। এখান থেকে শত শত আলোকিত মানুষ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাদের নাম ইতিহাসের পাতায় অনুস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কালের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক এ.কে.এম. শামছুল হক (ছমরু মিয়া) এবং আব্দুস ছোবহান (মদরিছ মাস্টার) সহ যারা অবদান রেখেছেন তাদের নাম।